বেইজিং, ২৯ মার্চ ২০২৫: ড. ইউনূসের চীন সফর – বাংলাদেশে বিনিয়োগের আহ্বান ও কৌশলগত সহযোগিতার নতুন দিগন্ত
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস চীনের শীর্ষ ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকদের সামনে বাংলাদেশকে একটি গ্লোবাল উৎপাদন হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনা উপস্থাপন করেছেন। তাঁর এই উদ্যোগকে চীনের বিনিয়োগকারীরা ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন, এবং বাংলাদেশ-চীন অর্থনৈতিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
ইউনূসের মূল বার্তা: “বাংলাদেশ এখন বিনিয়োগের সেরা সময়”
চীনের ১০০+ শীর্ষস্থানীয় কোম্পানির সিইও ও উদ্যোক্তাদের সঙ্গে চারটি ইন্টারঅ্যাক্টিভ সেশনে ড. ইউনূস নিম্নলিখিত বিষয়গুলো তুলে ধরেন:
- বাংলাদেশে উৎপাদন সুবিধা: সাশ্রয়ী শ্রম খরচ, বাণিজ্যিক নিষেধাজ্ঞামুক্ত পরিবেশ এবং প্রতিযোগিতামূলক বিনিয়োগ সুবিধা।
- কৌশলগত অবস্থান: বাংলাদেশ ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চল, নেপাল ও ভুটানের জন্য প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করতে পারে।
- যুবশক্তির সম্ভাবনা: তরুণ জনগোষ্ঠীকে কাজে লাগিয়ে ডিজিটাল ইকোনমি ও টেকসই শিল্প গড়ে তোলার পরিকল্পনা।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আকর্ষণীয় প্রস্তাব
বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিডা) ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী একটি উপস্থাপনায় উল্লেখ করেন:
- সংস্কার উদ্যোগ: বেসরকারি খাতকে ইজ অব ডুয়িং বিজনেস (EoDB) সুবিধা প্রদান, সরকারি সংস্থাগুলোর সমন্বয় বৃদ্ধি।
- অবকাঠামো উন্নয়ন: বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল (SEZ) প্রকল্পে দ্রুত অগ্রগতি, যা চীনা বিনিয়োগকারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা দেবে।
- আসন্ন বিনিয়োগ সম্মেলন: ঢাকায় আগামী দুই সপ্তাহ内 অনুষ্ঠেয় সম্মেলনে চীনের বৃহত্তম ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদল অংশ নেবে।
চীনা বিনিয়োগকারীদের প্রতিক্রিয়া
- চাইনিজ চেম্বার অব কমার্স (সিসিসিপিআইটি)-এর সহ-সভাপতি লি কিংশুয়াং বলেছেন,
- “অনেক চীনা কোম্পানি বাংলাদেশে বিনিয়োগে আগ্রহী, তবে সচেতনতার অভাব রয়েছে।”
- চীন-বাংলাদেশ বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে প্রচারমূলক ইভেন্ট ও প্ল্যাটফর্ম তৈরি করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর আলোচনা
ড. ইউনূস পরিকাঠামো, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, প্রযুক্তি ও শিক্ষা খাতের নেতাদের সাথে বৈঠক করেন। এতে অংশ নেওয়া কোম্পানিগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য:
- লংগি (বিশ্বের বৃহত্তম সোলার প্যানেল প্রস্তুতকারক)
- অপ্পো (স্মার্টফোন নির্মাতা)
- চায়না রেলওয়ে ইন্টারন্যাশনাল (মেট্রো ও রেল প্রকল্পে আগ্রহ)
- হিসেনস ফার্মাসিউটিক্যালস (জৈবপ্রযুক্তি ও ওষুধ শিল্পে সম্ভাবনা)
সামাজিক ব্যবসা ও ‘থ্রি জিরো’ ভিশন
একটি উচ্চপর্যায়ের গোলটেবিল আলোচনায় ড. ইউনূস “Three Zeros” (শূন্য দারিদ্র্য, শূন্য বেকারত্ব, শূন্য কার্বন নিঃসরণ) ধারণা উপস্থাপন করেন। পিকিং, সিংহুয়া ও রেনমিন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিদরা এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন।
- সিংহুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন লি দাওকুই প্রস্তাব দেন, বাংলাদেশের আমলাদের জন্য চীনের উন্নয়ন মডেল নিয়ে বিশেষ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
পরবর্তী পদক্ষেপ
- চীনা কোম্পানিগুলোর দ্রুত প্রতিনিধিদল ঢাকায় আসবে।
- সোলার এনার্জি, টেক্সটাইল, ফার্মাসিউটিক্যালস ও ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারে যৌথ প্রকল্প অন্বেষণ।
- চীন-বাংলাদেশ FTA (মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি) আলোচনা ত্বরান্বিত করতে পরামর্শ।
মূল্যায়ন
এই সফরে বাংলাদেশ চীনের রূপান্তরিত অর্থনীতির (China+1 কৌশল) একটি গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হয়েছে। যদি চীনা বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, তাহলে ২০২৬ সালের মধ্যে বাংলাদেশের রপ্তানি আয় ১০০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
সূত্র: বিডা, বেজা, সিসিসিপিআইটি, চীনা মিডিয়া ও বাংলাদেশি প্রতিনিধিদলের বিবৃতি।