
রংপুর, ২ জুন ২০২৬ — উত্তরের কয়েকটি জেলায় সম্প্রতি বাণিজ্যিকভাবে নেপিয়ার (Napier) উন্নত জাতের ঘাস চাষ দ্রুত প্রসারিত হচ্ছে। খড় ও প্রস্তুত গো-খাদ্যের ওপর ভরসা কমে যাওয়ায় কৃষকরা এখন মাঠে ঘাস ফলানোকে প্রধান আয়উৎস হিসেবে গ্রহণ করছেন। ধান বা অন্যান্য শস্যের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে নেপিয়ার ঘাস থেকে বেশি লাভ হওয়ায় বহু কৃষক পড়ন্ত-ফসল ছেড়ে স্থায়ী ঘাসচাষে মনোযোগ দিচ্ছেন। এতে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ছে এবং ছোটখাটো খামারগুলো আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হতে শুরু করেছে।
বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ, পীরগাছা, মিঠাপুকুর এবং সদর উপজেলায় দেখলে বয়ে বেড়ানো জমির বেশিরভাগই এখন ঘাসে ঘেরা—কর্তৃত্বে ধান নয়। স্থানীয় কৃষকদের কথায়, যেখানে এক একর ধানে বছরে দুইবার বেশি লাভ হতো না, সেখানে নেপিয়ার ঘাস বারবার কাটার ফলে বছরে কয়েকগুণ আয় দেখা যাচ্ছে। অনেকে বছরে ৪–৫ বার ঘাস কেটে বিক্রি করেন এবং খরচ বাদে প্রতি একর লাখ টাকার কাছাকাছি আয়ও অর্জন করছেন বলে দাবি করেছেন প্রত্যেক জেলা থেকে পাওয়া কৃষকরা।
গোপালপুরের মমদেল হোসেন জানান, নিজের দুই বিঘা জমিতে ঘাস চাষ করে খামারের চাহিদা মেটানোর পর বাকি ঘাস বিক্রি করে প্রতি বিঘায় বছরে ৩০–৩৫ হাজার টাকার অতিরিক্ত আয় হচ্ছে। মিঠাপুকুরের আমজাদ হোসেন বলেন, ভুষি-খৈল কেনা ছাড়ার ফলে খাদ্যের ব্যয় প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে, আর দুধও বেড়েছে। কালিগঞ্জের সোলায়মান মন্ডল তিন বিঘা জমিতে নেপিয়ার ঘাস চাষ করে বছরে প্রায় দুই লাখ টাকা উপার্জন করছেন — তাই তিনি ধান উত্পাদন বন্ধ করে দিয়েছেন।
চাষাবাদ পদ্ধতি ও খরচ-ঝুঁকি
কৃষক ও উপজেলা কৃষি পরামর্শীরা বলছেন, নেপিয়ার ঘাস রোপণের পরে চার—পাঁচ বছর পর্যন্ত পুনরাবৃত্তি কাটা যায়, ফলে বারবার জমি হচ্ছে না ভাঙা। সার, কীটনাশক ও মজুরির খরচ সাধারণ ফসলের তুলনায় কম লাগে। পরিচর্যায় গোবর সার ও মৌসুমভিত্তিক ইউরিয়া ও টিএসপি দেওয়ার পরামর্শ সাধারণ। উচ্চ জমিতে ভালো ফলন আসে এবং বর্ষাকাল ঘাস রোপণের উপযোগী বলে অভিজ্ঞতা দেখা গেছে। বাজারে এখন ঘাস বাঁধা হিসেবে বিক্রি হচ্ছে এবং কোরবানি বা উৎসবে চাহিদা খাড়া হয় বলে ব্যবসায়ীরাও জানান।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ ও সুফল
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদফতর জানায়, প্রশাসন বিনামূল্যে উন্নত জাতের কাটিং বিতরণ ও চাষপ্রকরণে প্রশিক্ষণ দিচ্ছে। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ওই অঞ্চলের প্রায় ৪,০৪০ একর ছিল, আর ২০২৫-২৬ সালে তা বেড়ে ১১,০৯০ একরের বেশি হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা প্রায় ৯৭,০০০ মেট্রিক টন ধরা হয়েছে। জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. নাজমুল হুদা বলছেন, ডেইরি সেক্টরের স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে এবং গবাদিপশুর পুষ্টি নিশ্চিত করতে উচ্চ ফলনশীল ঘাসের চাষ অপরিহার্য।
চ্যালেঞ্জ ও সুপারিশ
উত্তরের কৃষকদের জীবনে নেপিয়ার ঘাস দ্রুত আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে এসেছে। স্থানীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য, খরচ-নিয়ন্ত্রিত এবং পুষ্টিতত্ত্বসমৃদ্ধ এই ঘাস চাষ বাংলাদেশে ডেইরি খাতকে শক্তিশালী করার ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা রাখতে পারে — তবে দীর্ঘমেয়াদি টেকসইতা নিশ্চিত করতে গবেষণা, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সহায়তা বাড়ানো জরুরি।
এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ব্যতীত ব্যবহার বেআইনি ।
2023 DailyNews24BD.com