
ঢাকা, ১৫ জুলাই, ২০২৬ : চলমান এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের অতিরিক্ত কঠিন মান এবং ভুল প্রশ্নপদ্ধতির কারণে সাধারণ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম অনিশ্চয়তা ও ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। চলমান এই শিক্ষাসংকট এবং দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি ত্রুটি দূর করতে সরকারের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন বাংলাদেশ সংস্কারবাদী পার্টির মহাসচিব ও সচেতন অভিভাবক মোঃ নাজমুল আলম।
বাংলাদেশ সংস্কারবাদী পার্টি (বিআরপি) হলো বাংলাদেশের একটি নতুন রাজনৈতিক দল, যা ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ও প্রগতিশীল বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়。 ২০২৪ সালের নভেম্বরে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করা এই দলটির নেতৃত্বে আছেন চেয়ারম্যান মো. সোহেল রানা এবং মহাসচিব মো. নাজমুল আলম ।
আজ এক বিবৃতিতে তিনি বলেন, "চলমান এইচএসসি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্রের মান এতটাই কঠিন করা হচ্ছে যা অনেক শিক্ষকের পক্ষেই তাৎক্ষণিক উত্তর দেওয়া অসম্ভব। করোনা আমলের দীর্ঘ শিক্ষাজনিত ঘাটতি (লার্নিং গ্যাপ) এখনও যেখানে অপূরণীয়, সেখানে শিক্ষাব্যবস্থার গুণগত মানোন্নয়ন না করে কেবল পরীক্ষার প্রশ্ন কঠিন করে শিক্ষার্থীদের জীবনকে অন্ধকারের দিকে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। এমনকি পরীক্ষা কেন্দ্রে প্রশ্নপত্রে একাধিক ভুলের কারণে শিক্ষার্থীদের চোখের জল ফেলতে দেখা গেছে, যা একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।"
বিবৃতিতে দেশের সামগ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামোগত সংকট ও তার উত্তরণে সুনির্দিষ্ট পর্যবেক্ষণ ও সমাধান তুলে ধরা হয়:
আমাদের বর্তমান আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থার মূল ভিত্তি এখনও ঔপনিবেশিক ব্রিটিশ আমলের কেরানি ও অনুগত সেবক তৈরির দর্শনের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। এটি আমাদের নিজস্ব জাতীয় ও নৈতিক সংস্কৃতির বিকাশের পরিপন্থী। বর্তমানে পাঠ্যসূচি এমনভাবে সাজানো হয়েছে যে, গদবাঁধা মুখস্থ না করলে ভালো ফলাফল অসম্ভব। অথচ বিশ্ব আজ সাইন্টিফিক, লজিক্যাল ও টেকনিক্যাল দক্ষতাকে মূল্যায়ন করছে। সফটওয়্যার বা তথ্যপ্রযুক্তির মতো সম্ভাবনাময় খাতে লজিক্যাল সেন্স ছাড়া উন্নয়ন অসম্ভব হলেও আমাদের দেশে এর সুযোগ সীমিত। ফলে অকালেই ঝরে পড়ছে দেশের মেধাবী ছাত্ররা।
একটি দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হলো শিক্ষা। বিশ্ব শিক্ষা ফোরামের নির্দেশনা অনুযায়ী জিডিপির কমপক্ষে ৬ শতাংশ শিক্ষা খাতে বরাদ্দ দেওয়া উচিত। অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ ও নোবেলজয়ী রবার্ট সলো এবং আর্থার শুলজের গবেষণা প্রমাণ করে যে, শিক্ষায় বিনিয়োগের সুফল সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক। অথচ বাংলাদেশে বাজেটে শিক্ষা খাতকে যথাযথ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে না। গণতান্ত্রিক সরকারের উচিত শিক্ষা খাতে মোট বাজেটের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ এবং জাতীয় আয়ের ৮ শতাংশ বরাদ্দ রাখা এবং শিক্ষার বাণিজ্যিকীকরণ বন্ধ করা।
মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে সৃজনশীল পদ্ধতি চালু করা হলেও শিক্ষকদের জীবনযাত্রার মান ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হয়নি। বর্তমান দুর্মূল্যের বাজারে পর্যাপ্ত বেতন-ভাতার অভাবে শিক্ষকরা বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় জড়িয়ে পড়ছেন। এছাড়া, বিদ্যালয়ে ৬০:১ অনুপাতে শিক্ষক থাকার কথা থাকলেও তীব্র শিক্ষক সংকট বিদ্যমান। এর ওপর শিক্ষকদের বিভিন্ন অনাকাঙ্ক্ষিত অ-শিক্ষামূলক সরকারি দায়িত্ব ও ম্যানেজিং কমিটির অনৈতিক চাপ সামলাতে হয়, যা পাঠদানকে মারাত্মক ব্যাহত করে। একই সাথে শিক্ষকদের সৃজনশীল পদ্ধতির ওপর আধুনিক প্রশিক্ষণের চরম ঘাটতি রয়েছে।
বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের সঠিক নৈতিক ও ধর্মীয় জীবন দর্শন দিতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে শিক্ষিত যুবসমাজের একাংশের মধ্যে নৈতিক অধঃপতন, দুর্নীতি, ঘুষ, চোরাকারবারি, স্বজনপ্রীতি ও মাদকাসক্তির মতো জঘন্য অপরাধের প্রবণতা বাড়ছে। ছাত্ররাজনীতির নামে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সন্ত্রাস ও সেশনজট তৈরি হচ্ছে, যা দেশ পরিচালনার যোগ্য নেতৃত্ব ও দেশপ্রেমিক জনশক্তি গড়ে তোলার পথে মূল অন্তরায়।
দেশের আলিয়া ও কওমি (দারসে নেজামি) উভয় ধারার মাদ্রাসা শিক্ষাই কয়েক শতাব্দীর প্রাচীন ও জরাজীর্ণ কাঠামোর মধ্যে আটকে আছে। এখানে সমকালীন রাষ্ট্রবিজ্ঞান, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, আইন ও পররাষ্ট্রনীতির মতো জরুরি বিষয়গুলোর কোনো স্থান নেই। ফলে মাদ্রাসা থেকে পাস করা বিপুল জনশক্তি সিভিল সার্ভিস, সামরিক বাহিনী, চিকিৎসা, প্রকৌশল বা কর্পোরেট খাতে যুক্ত হতে পারছে না। তারা সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে হেয় প্রতিপন্ন হচ্ছে এবং কর্মহীনতার কারণে অনেকে ধর্মীয় কোন্দল ও বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছে। সামান্য কিছু বিষয় জোড়াতালি দিয়ে সংস্কারের চেষ্টা করা হলেও এর মূল কাঠামোগত কোনো পরিবর্তন আসেনি।
১. প্রশ্নপদ্ধতি ও মূল্যায়ন সংস্কার: চলমান এইচএসসি পরীক্ষাসহ সব স্তরে ত্রুটিমুক্ত প্রশ্নপত্র নিশ্চিত করতে হবে। গদবাঁধা মুখস্থ পরীক্ষার পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Continuous Assessment) এবং প্রজেক্ট-ভিত্তিক কাজের মাধ্যমে শিক্ষার্থীর প্রকৃত মেধা, চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা যাচাই করতে হবে।
২. বাস্তবমুখী ও কারিগরি শিক্ষা: পাঠ্যক্রমে প্র্যাকটিক্যাল, লজিক্যাল, টেকনিক্যাল ও সায়েন্টিফিক বিষয়সমূহকে বাধ্যতামূলক করতে হবে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার ব্যাপক প্রসার ঘটাতে হবে যাতে শিক্ষার্থীরা শিক্ষা শেষ করেই সরাসরি কর্মসংস্থানে প্রবেশ করতে পারে।
৩. শিক্ষকদের অধিকার ও স্বচ্ছ নিয়োগ: শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় শতভাগ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করে প্রকৃত মেধাবীদের এই পেশায় আনতে হবে। শিক্ষকদের বেতন বৈষম্য দূর করে সম্মানজনক বেতন-ভাতা দিতে হবে এবং প্রশাসনিক কাজের চাপ কমিয়ে সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে পাঠদানের সুযোগ দিতে হবে। একই সাথে নিয়মিত আধুনিক প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে।
৪. বাজেট বৃদ্ধি ও বাণিজ্যিকীকরণ রোধ: বিশ্ব শিক্ষা ফোরামের গাইডলাইন অনুযায়ী জাতীয় বাজেটের ২৫% শিক্ষা খাতে বরাদ্দ করতে হবে এবং শিক্ষার বাণিজ্যিক রূপ বন্ধ করে মানসম্মত শিক্ষা সবার জন্য সহজলভ্য করতে হবে।
৫. মাদ্রাসা শিক্ষার আধুনিকায়ন: মাদ্রাসা শিক্ষাকে কেবল ধর্মীয় লেজুড়বৃত্তি বা ইমামতির মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে একে আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, অর্থনীতি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সাথে সমন্বিত করতে হবে। যাতে মাদ্রাসা শিক্ষার্থীরাও দেশের নীতি নির্ধারণী ও উৎপাদনশীল খাতে সমান অবদান রাখতে পারে।
৬. শিক্ষায় অভিভাবক সম্পৃক্ততা: বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনায় রাজনৈতিক প্রভাব ও ম্যানেজিং কমিটির অনৈতিক হস্তক্ষেপ বন্ধ করে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সরাসরি সম্পৃক্ততা বাড়াতে হবে, যাতে শিক্ষার্থীদের মানসিক ও সামাজিক বিকাশ নিশ্চিত করা যায়।
৭. নৈতিক শিক্ষার বিস্তার: শিক্ষার্থীদের মেধার পাশাপাশি তাদের নৈতিক মূল্যবোধ, দেশপ্রেম এবং ধর্মীয় অনুশাসনকে শিক্ষার মূলধারায় সম্পৃক্ত করতে হবে, যেন তারা দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে।
বাংলাদেশ সংস্কারবাদী পার্টি মনে করে, শিক্ষা ব্যবস্থার এই আমূল পরিবর্তন ছাড়া দেশের মেধাবী তরুণদের ভবিষ্যৎ রক্ষা করা সম্ভব নয়। শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সকল অংশীজনকে অবিলম্বে এই সংকট নিরসনে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেওয়ার জোর আহ্বান জানানো হচ্ছে।
এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ব্যতীত ব্যবহার বেআইনি ।
2023 DailyNews24BD.com