
ঢাকা, ২৩ জুলাই, ২০২৬ : বাংলাদেশের ২২তম রাষ্ট্রপ্রধান মো. সাহাবুদ্দিন মেয়াদ শেষের আগেই স্বেচ্ছায় বঙ্গভবন ছাড়তে পারেন বলে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোচনা চলছে। ২০২৩ সালের এপ্রিলে আওয়ামী লীগের মনোনয়নে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় দায়িত্ব নেওয়া এই রাষ্ট্রপতির নিয়মিত মেয়াদ ছিল ২০২৮ সাল পর্যন্ত। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে তিনি একমাত্র ব্যক্তি, যিনি পূর্ববর্তী আমলের শীর্ষ সাংবিধানিক পদে বহাল রয়েছেন।
কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুঞ্জন নয়, বরং এর পেছনে গভীর কিছু রাজনৈতিক ও কৌশলগত কারণ রয়েছে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন:
রাষ্ট্রপতি পদত্যাগ করলে রাষ্ট্রযন্ত্রে কোনো শূন্যতা তৈরি হবে না, কারণ সংবিধানে এর স্পষ্ট সমাধান রয়েছে:
বর্তমানে সংসদে বিএনপির নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় নতুন রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচনে তাদের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত হবে। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে দুটি ভিন্ন ধারা আলোচনায় রয়েছে:
যদিও সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বা বঙ্গভবনের পক্ষ থেকে এখনও কোনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি এবং একে 'গুঞ্জন' বলে অভিহিত করা হয়েছে, তবে ক্ষমতার অলিন্দে থাকা সূত্রগুলো ইঙ্গিত দিচ্ছে যে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই এই দৃশ্যপট স্পষ্ট হতে পারে।
স্বাস্থ্যগত কারণে পদত্যাগ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। চলতি মাসেই তিনি বঙ্গভবন ছাড়ছেন। উন্নত চিকিৎসার জন্য যেতে চান সিঙ্গাপুর। এর আগে ওই দেশেই বাইপাস সার্জারিসহ হৃদরোগের চিকিৎসা নিয়েছিলেন তিনি। রাষ্ট্রপতি তার এ ব্যক্তিগত অভিপ্রায়ের কথা বঙ্গভবনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও নিকটজনদের জানিয়েছেন। বঙ্গভবন সূত্র আমার দেশকে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
তবে রাষ্ট্রপতির এ অভিপ্রায়ের বিষয়ে সরকারের কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা অভিমত পাওয়া যায়নি। রাষ্ট্রপতি দেশের সাংবিধানিক অভিভাবক, তিনি যতদিন এ পদে থাকবেন সরকারে তার সাংবিধানিক সম্পর্ক বজায় থাকবে। তিনি পদ থেকে ইস্তফা দিলে সংবিধান অনুযায়ী শূন্যতা পূরণ হবে; যেহেতু অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে দেশে একটি শক্তিশালী সংসদ কার্যকর রয়েছে।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের অভিপ্রায় ও শারীরিক অবস্থার বিষয়ে বঙ্গভবনের ওই সূত্রটি জানিয়েছে, তিনি খুবই অসুস্থ। এ অবস্থায় তার দায়িত্ব অব্যাহত রাখা অসম্ভব। চলতি মাসেই দুদফায় সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করিয়েছেন তিনি। তার সিটি স্ক্যান ও এমআরআই রিপোর্ট ভালো আসেনি। হৃদরোগজনিত দুর্বলতার পাশাপাশি তার নিউরোলোজিক্যাল সমস্যা ধরা পড়েছে।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের টিম রাষ্ট্রপতিকে অতি দ্রুত উন্নত চিকিৎসার পরামর্শ দিয়েছেন। পাশাপাশি তাকে পূর্ণ বিশ্রামে থাকার কথাও বলেছেন তারা। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের একজন কর্মকর্তা জানান, এ মুহূর্তে তার চিকিৎসাকে অগ্রাধিকার দিচ্ছে পরিবারও।
ওই কর্মকর্তা জানান, রাষ্ট্রপতি জানিয়েছেন মাত্র কয়েকদিন আগে তিনি যুক্তরাজ্য থেকে মেডিকেল চেকআপ করে এসেছেন। এখন আবার চিকিৎসার জন্য সিঙ্গাপুর যাওয়ার কথা বলা শোভনীয় হবে না। রাষ্ট্রেরও কিছুটা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। ফলে তিনি পদত্যাগের সিদ্ধান্তই নিয়েছেন। প্রক্রিয়া শেষে চলতি মাসেই তিনি বঙ্গভবন ছাড়বেন বলে জানান ওই কর্মকর্তা।
জুলাই বিপ্লবের পর থেকেই মানবতাবিরোধী অপরাধে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত শেখ হাসিনার শাসনামলে নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগের দাবি ওঠে। তার পদত্যাগের দাবিতে ওই সময় জুলাই বিপ্লবীরা একাধিকবার বঙ্গভবন ঘেরাওসহ কঠোর কর্মসূচি পালন করেন। রাষ্ট্রপতিকে সরিয়ে দিতে ওই সময় অন্তর্বর্তী সরকারেরও সায় ছিল বলে জানা যায়।
তবে রাষ্ট্রপতি চলে গেলে ‘সাংবাধানিক সংকট হবে’ এক বা একাধিক দলের এমন যুক্তির কারণে শেষ পর্যন্ত তা কার্যকর হয়নি। অবশ্য পদত্যাগ নিশ্চিত করা না গেলেও ওই সময় রাষ্ট্রপতিকে অনেকটাই একঘরে করে রাখা হয়েছিল বলে জানা যায়।
বিএনপির নেতৃত্বে নতুন গণতান্ত্রিক সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথমদিকে হাসিনার ‘আস্থাভাজন’ রাষ্ট্রপতিকে বিদায় দেওয়ার আলোচনা শুরু হয়। কিন্তু ‘সেফ এক্সিট’ ও ‘চতুর্থদশ নির্বাচনের সময় রাষ্ট্রপতি পদে কে থাকবেন’ এমন আলোচনা সামনে এলে তা বেশিদূর আগায়নি। এ সময় সরকার রাষ্ট্রপতির বিষয়ে কিছুটা ‘সফট’ হন বলেও জানা গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সরকারের তরফ থেকে রাষ্ট্রপতির ‘অভিপ্রায়ে’ এক বছর সময় দেওয়ার সম্মতি মেলে। এ সময় অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরিয়ে নেওয়া প্রেস সচিবকে আবারও রাষ্ট্রপতির দপ্তরে পদায়ন করা হয়। পাশাপাশি রাষ্ট্রপতির দফতরে একাধিক কর্মকর্তাকে পদায়ন করে তার জনবল বাড়ানো হয়।
তবে লন্ডন সফরের পর সরকারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতির দূরত্ব তৈরি হয়। সরকারের তরফ থেকে অভিযোগ করা হয়, সফরে হাসিনার সঙ্গে রাষ্ট্রপতি যোগাযোগ করেছেন। লন্ডন আওয়ামী লীগের এক নেতার মাধ্যমে তিনি ওই সময়ে ভারতে পলাতক হাসিনার সঙ্গে টেফিফোনে কথাও বলেন।
এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার ও রাষ্ট্রপতির সম্পর্কের চরম অবনতি হয়। অর্থবিল সই ও বাজেট অধিবেশন প্রত্যক্ষণ করতে গত ১১ জুন রাষ্ট্রপতি জাতীয় সংসদে গেলে সরকারের সংশ্লিষ্ট্র কেউ তার সঙ্গে সাক্ষাতও করেননি বলে গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়। ব্রেকিংনিউজ
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, সরকারের সঙ্গে বাড়তে থাকা দূরত্ব আর চরম আস্থার সংকটে পড়ে শেষ পর্যন্ত পদত্যাগের পথেই হাঁটতে হচ্ছে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে। আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই রাষ্ট্রপতির বিদায়ের সম্ভাবনা প্রবল। ইতোমধ্যে বঙ্গভবন থেকে এমন স্পষ্ট ইঙ্গিত মেলায় রাজনৈতিক অঙ্গন ও দেশের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে তোলপাড় সৃষ্টি হয়েছে ।
বঙ্গভবনে রাষ্ট্রপতির ঘনিষ্ঠ ও দায়িত্বশীল একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, রাষ্ট্রপতি পদত্যাগের আভাস দিয়েছেন। আগামী সাতদিনের মধ্যে এ বিষয়টি দৃশ্যমান হতে পারে বলে বঙ্গভবন ও সরকারি সূত্র জানিয়েছে।
সাহাবুদ্দিন আওয়ামী লীগের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল রাষ্ট্রপতির পদে শপথ নেন। এ হিসাবে তিনি এখন পর্যন্ত তিন বছর তিন মাস দায়িত্ব করেন।
সংবিধানের বিধান অনুযায়ী [১২৩(৩) অনুচ্ছেদ] পদত্যাগ মৃত্যু বা অপসরণের কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে এ তারিখ থেকে পরবর্তী ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে হবে। রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে নতুন রাষ্ট্রপতি শপথ নেওয়ার আগ পর্যন্ত স্পিকার ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন এক গণমাধ্যম-এর সঙ্গে একান্ত আলাপচারিতায় নিজের বেশকিছু আগ্রহ আর ইচ্ছার কথা প্রকাশ করেছিলেন। ওই সময় তার পদত্যাগের প্রসঙ্গটিও এসেছিল। বঙ্গভবনে এখন কেমন আছেন, কবে নাগাদ পদ ছাড়তে চান? এমন প্রশ্ন ছিল রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দিনের কাছে। জবাবে স্মিত হেসে বলেন, দেশের সর্বোচ্চ পদে আছি। সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার মধ্যে থেকে রাষ্ট্রের কল্যাণে যতটুকু করার সর্বোচ্চটা করার চেষ্টা করেছি। এখন সম্মানের সঙ্গে যেতে চাই। সরকার যখন বলবে, আমি বঙ্গভবন ছাড়তে প্রস্তুত।
সূত্রঃ আমার দেশ (বঙ্গভবন)
এই ওয়েব সাইটের কোন লেখা, ছবি, অডিও, ভিডিও অনুমতি ব্যতীত ব্যবহার বেআইনি ।
2023 DailyNews24BD.com