“মালিটোলার নাদের” ছিলেন পুরান ঢাকার একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা, যার বীরত্বগাথা ইতিহাসের পাতায় ঠিকমতো স্থান পায়নি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের শুরুতে তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর বিরুদ্ধে গেরিলা প্রতিরোধ গড়ে তোলেন, কিন্তু পরবর্তীতে শত্রুপক্ষের হাতে ধরা পড়ে নির্মমভাবে শহীদ হন। তার জীবন ও সংগ্রামের কিছু উল্লেখযোগ্য দিক:
প্রারম্ভিক জীবন:
- নাদের মিয়ার জন্ম পুরান ঢাকার মালিটোলায়।
- জগন্নাথ কলেজে পড়াশোনা করেছিলেন এবং ছাত্রলীগের সাথে যুক্ত ছিলেন।
- পরে স্থানীয় পর্যায়ে প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হন, যদিও অনেকেই তাকে “গুণ্ডা” বা “রংবাজ” হিসেবে চিনতেন।
মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকা:
- ২৫ মার্চের কালরাত: পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা শুরুর পরই নaders বংশালের ঈশা ব্রাদার্স ভবনের ছাদ থেকে পাক সেনাদের উপর অতর্কিত আক্রমণ চালান।
- গেরিলা যুদ্ধ: তিনি পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় (আরমানিটোলা, সিদ্দিক বাজার, শ্যামবাজার, নবাবপুর ) দ্রুত গেরিলা আক্রমণ পরিচালনা করে পাক বাহিনীকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলেন।
- সাহসিকতা: নাদের ও তার সঙ্গীরা পাক সেনাদের কয়েকজন অফিসারকে হত্যা করেন, যা পাকিস্তানি বাহিনীকে ভীতসন্ত্রস্ত করে তোলে।
ধরা পড়া ও শহীদ হওয়া:
- মে মাসের শেষদিকে আরমানিটোলায় একটি শান্তি কমিটির সভায় আক্রমণের পরিকল্পনা করেছিলেন নাদের, কিন্তু এক বিহারী সহযোগীর বিশ্বাসঘাতকতায় পাক সেনাদের হাতে ঘেরাও হন। নাদের তার ভাই হারুন ও সহযোদ্ধা সোহরাব শহীদ হন। নাদের ও পায়ে গুলিবিদ্ধ হন এবং পাক বাহিনীর হাতে ধরা পড়েন।
- ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে তাকে নির্মম নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়।
পারিবারিক ট্র্যাজেডি:
- নadersের স্ত্রী মনোয়ারা আক্তার ও একমাত্র সন্তান বুলু যুদ্ধপরবর্তী সময়ে অবহেলা ও দারিদ্র্যের শিকার হন।
- সরকারি কোনো স্বীকৃতি বা সহায়তা না পেয়ে মনোয়ারাকে দ্বিতীয়বার বিয়ে করতে হয়, এবং নadersের উত্তরাধিকার প্রায় বিস্মৃতির অন্তরালে চলে যায়।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব:
- নাদের ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের প্রথম পর্যায়ের সেসব সাহসী বেসামরিক যোদ্ধাদের একজন, যারা প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন।
- তার সংগ্রাম স্থানীয় জনগণকে উদ্বুদ্ধ করেছিল, কিন্তু রাষ্ট্রীয়ভাবে তার ত্যাগের স্বীকৃতি মেলেনি।
এই গল্পটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য অনালোচিত বীরদের মধ্যে একজনকে স্মরণ করিয়ে দেয়, যাদের আত্মদান জাতির ইতিহাসের অমূল্য অধ্যায়। নাদের’র মতো ব্যক্তিদের ইতিহাস চর্চায় অন্তর্ভুক্ত করা মুক্তিযুদ্ধের বহুমাত্রিকতাকে আরও সমৃদ্ধ করবে।