ঢাকা, ০৩ জুন, ২০২৬ : বাংলাদেশ সরকার আগামী অর্থবছরের শুরু থেকেই সরকারি ক্রয়ের পুরো প্রক্রিয়াকে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে স্থানান্তর করতে যাচ্ছে। ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে ইলেকট্রনিক গভর্নমেন্ট প্রকিউরমেন্ট (ই-জিপি) ছাড়া কোনো ধরনের কাগজভিত্তিক টেন্ডার আহ্বান করা হবে না—এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে কর্তৃপক্ষ। এই উদ্যোগকে দেশের পাবলিক ক্রয় ব্যবস্থায় একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিপিপিএ’র প্রধান নির্বাহী এস. এম. মঈন উদ্দীন আহম্মেদ জানান, ইতিমধ্যেই চলমান যেসব টেন্ডার প্রক্রিয়া ১ জুলাই-এর আগে ম্যানুয়ালি শুরু হয়েছে, সেগুলোর বাকি ধাপ ম্যানুয়ালভাবে চলতে পারবে; কিন্তু ওই তারিখের পর নতুন কোনো অফলাইন দরপত্র চালু করা সম্ভব হবে না। একই সঙ্গে, ই-জিপি থেকে ছাড় প্রার্থনার অনুরোধও ২০২৬ সালের ৩০ জুনের পরে গ্রহণযোগ্য হবে না।
সরকার বলছে, সম্পূর্ণ ই-জিপি বাস্তবায়ন সরকারি ক্রয়ে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং কার্যকারিতা বাড়াতে তাদের অঙ্গীকারের অংশ। দেশের বার্ষিক বাজেট ও উন্নয়ন খরচে সরকারি ক্রয়ের অবদান বিশাল—জাতীয় বাজেটের প্রায় ৪৫% এবং বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির প্রায় ৮৫% সরকারি ক্রয়ে ব্যয় হয়—তাই এই খাতের সংস্কার সঠিক অর্থ ব্যয়ের নিশ্চয়তা ও সেবা উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।
সম্প্রতিই প্রণীত পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) আইন, ২০২৬ এবং পিপিআর‑২০২৫-এর মাধ্যমে ক্রয় বিধি-প্রণালী আন্তর্জাতিক মানের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পুনর্রচনা করা হয়েছে। এসব পরিবর্তনের মূল লক্ষ্য ছিল ই-জিপিকে ক্রয়ের কেন্দ্রীয় প্ল্যাটফর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা, একই সঙ্গে দরপত্র থেকে চুক্তি ও অর্থ প্রদায়ের সব ধাপ অনলাইনে সম্পন্ন করা।
প্রাথমিক ফলাফল ইতোমধ্যে চোখে পড়ছে। নতুন বিধিমালা কার্যকর হওয়ার পর দরপত্রে প্রতিদ্বন্দ্বিতা বেড়েছে; ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর‑ডিসেম্বরের মধ্যে গড় দরদাতার সংখ্যা ২.২ থেকে প্রায় ৮.৪ জনে উন্নীত হয়েছে। ই-জিপিতে প্রতিদিন নিবন্ধন আবেদনও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়েছে—পূর্বে গড়ে ৬০–৭০টি থেকে এখন প্রায় ২০০–৩০০টি পর্যন্ত। নারী উদ্যোক্তাদের অংশগ্রহণও বাড়ছে; সিস্টেমে বর্তমানে ৭,৪০৮ জন নারী দরদাতা নিবন্ধিত রয়েছেন, যাদের মধ্যে ১,০৪৭ জন সম্প্রতি নিবন্ধন করেছেন।
মূল্যের যৌক্তিকতাও কিছুটা উন্নত হয়েছে—নির্মাণ সামগ্রীর ক্ষেত্রে সরকারি অনুমানমূল্য ও প্রস্তাবিত দরপত্র মূল্যের গড় পার্থক্য ঋণাত্মক ১০% থেকে কমে ঋণাত্মক ৭% এ নামেছে। এর ফলে অস্বাভাবিকভাবে কম দরপত্র জমা দেওয়ার প্রবণতা কমছে এবং প্রকল্পের বাস্তব্যয়তা বৃদ্ধি পাচ্ছে।
পিপিআর‑২০২৫-এ ১৫৪টি বিধি ও ২১টি তালিকা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য সংস্কারগুলোর মধ্যে আছে: সরকারি ক্রয়ে বাজারভিত্তিক মূল্য নির্ধারণ, ই-জিপি বাধ্যতামূলককরণ, চুক্তি প্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত অংশীদারদের তথ্য প্রকাশ, টেকসই ক্রয় নীতির প্রবর্তন, নারী ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য ক্রয় বাজেটের ২৫% সংরক্ষণ, এবং প্রতিটি মন্ত্রণালয়ে নিবন্ধিত ‘ক্রয় ইউনিট’ স্থাপন। এগুলি ক্রয়কে কেবল প্রশাসনিক কাজ নয়, নীতি-নির্ধারণ ও সুশাসনের একটি কৌশলগত হাতিয়ার হিসেবে প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে নেওয়া হয়েছে।
ই-জিপি চালুর পর সামগ্রিকভাবে কার্যকারিতা বৃদ্ধি পেয়েছে—সরকারি ক্রয়ের গড় সময়ে হ্রাস দেখা গেছে; ২০২৬ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত গড় সময়সীমা এখন প্রায় ৫৪ দিন। দরপত্র বিজ্ঞপ্তি, কার্যাদেশ ও চুক্তি অনুমোদনের তথ্য শতভাগ অনলাইনে প্রকাশ করা হচ্ছে, যা স্বচ্ছতা বাড়াচ্ছে এবং জনসাধারণের নজরদারি সহজ করছে।
তবু কিছু চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে। বিপিপিএ বলছে, ক্রয়ের স্থানীয় একাধিক প্রতিষ্ঠান ও দরদাতাদের সক্ষমতা উন্নত করা, চুক্তি ব্যবস্থাপনা শক্তকরণ, নৈতিক মান বজায় রাখা এবং আচরণগত পরিবর্তন ত্বরান্বিত করা জরুরী। প্রযুক্তি থাকলেই বদবসতাহীন সংস্কার নিশ্চিত হয় না—মানবসম্পদ, নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং কার্যকর তদারকি দরকার।
এ বিষয়ে কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা হিসেবে রয়েছে প্রশিক্ষণ কৌশল জোরদার করা, পিপিআর বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি, এবং প্রস্তাবিত ইনস্টিটিউট অব পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (আইপিপি) গঠন করে তা একটি প্রশিক্ষণ ও গবেষণা কেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা। আইপিপি থেকে রিসোর্স পারসন, প্রকল্প পরিচালক ও ক্রয় কর্মকর্তাদের জন্য নিয়মিত কর্মশালা ও সার্টিফিকেশন প্রদান করা হবে।
সংক্ষেপে, পূর্ণ ডিজিটাল সরকারি ক্রয়ে রূপান্তর কেবল প্রযুক্তিগত পরিবর্তন নয়; এটি সরকারি ব্যয় ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা প্রতিষ্ঠার জন্য একটি সিস্টেমেটিক উদ্যোগ। সফল বাস্তবায়ন হলে বাংলাদেশের পাবলিক ক্রয় নীতি উন্নত হবে এবং আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও সরকারি সেবার মান বৃদ্ধি পাবে। কিন্তু এটি নিশ্চিত করতে ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, কড়া তদারকি ও প্রতিষ্ঠানগত সংস্কার অপরিহার্য।

