ঢাকাবুধবার , ৪ঠা নভেম্বর, ২০২৬ খ্রিস্টাব্দ
  • অন্যান্য
  1. অর্থনীতি
  2. আন্তর্জাতিক
  3. খেলাধুলা
  4. জাতীয়
  5. জীবনধারা
  6. বিজ্ঞান-প্রযুক্তি
  7. বিনোদন ভুবন
  8. বিবিধ
  9. ভিডিও নিউজ
  10. রাজধানী
  11. রাজনীতি
  12. শিক্ষা
  13. সর্বশেষ
  14. সারাবাংলা
  15. স্বাস্থ্য
আজকের সর্বশেষ সবখবর

ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘স্যান্ডর’-এর সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করছে না সরকার

লাবনী হোসেন
নভেম্বর ৩, ২০২৬ ১:৪২ অপরাহ্ণ
Link Copied!

ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘স্যান্ডর’-এর সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করছে না সরকার: বন্ধের শঙ্কা ও বিকল্প ভাবনায় কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা

নিজস্ব প্রতিবেদক: আগামী ২৯ নভেম্বর শেষ হতে যাচ্ছে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় ভারতীয় প্রতিষ্ঠান ‘স্যান্ডর মেডিকেইডস প্রাইভেট লিমিটেড’-এর সঙ্গে ১০ বছর মেয়াদি ডায়ালাইসিস সেবা চুক্তি। সরকার এই চুক্তির মেয়াদ আর না বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নেওয়ায় ঢাকার জাতীয় কিডনি রোগ ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউট (নিকডু) এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে গরিব ও স্বল্প আয়ের রোগীদের কিডনি ডায়ালাইসিস সেবা বন্ধ হওয়ার শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

চুক্তি শেষ হওয়ার পর নতুন ব্যবস্থাপনায় সেবা চালু করতে সময় লাগার সম্ভাবনা থাকায় মাঝের এই কয়েক মাস হাজার হাজার রোগীর চিকিৎসা নিয়ে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।

চুক্তির পটভূমি ও সরকারের সিদ্ধান্ত

২০১৫ সালে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ভারতীয় প্রতিষ্ঠান স্যান্ডরের সঙ্গে ১০ বছর মেয়াদি চুক্তি করে। এর আওতায় ২০১৭ সালের ৪ মার্চ থেকে ঢাকার জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট এবং চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০১টি ডায়ালাইসিস যন্ত্রের মাধ্যমে সেবা দেওয়া শুরু হয়। তবে এই চুক্তির কারণে সরকারি হাসপাতালের নিজস্ব সক্ষমতা সংকুচিত হয়ে পড়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। চুক্তি অনুযায়ী স্যান্ডরের ব্যবহৃত বিদ্যুৎ ও পানির বিল বহন করার পাশাপাশি প্রতিটি সেশনে সরকারকে ২ হাজার ৭৭৭ টাকা ভর্তুকি দিতে হতো। এছাড়া প্রতি বছর ৫ শতাংশ হারে ডায়ালাইসিসের খরচ বৃদ্ধি এবং সরকারি হাসপাতালে নতুন কোনো ডায়ালাইসিস যন্ত্র স্থাপনে বিধিনিষেধ থাকায় দেশের কিডনি চিকিৎসা বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছিল।

এই প্রেক্ষাপটে সরকার স্যান্ডরের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন না করার সিদ্ধান্ত নেয়। স্যান্ডর ডায়ালাইসিস ফি ৬০০ টাকা কমানোর প্রস্তাব দিলেও তা নাকচ করে দিয়ে সরকার নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ও বিকল্প উপায়ে এই সেবাগুলো পরিচালনার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে।

কেন তৈরি হয়েছে অনিশ্চয়তা?

এদিকে স্যান্ডরের সঙ্গে চুক্তি শেষ হওয়ার প্রক্রিয়া ঘিরে নতুন ডায়ালাইসিস মেশিন কেনার জন্য একাধিক দরপত্র বাতিল এবং তৃতীয় দরপত্রে অস্বাভাবিক শর্ত যুক্ত করার অভিযোগ তুলেছে পাঁচটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। এতে নিম্নমানের যন্ত্র সরবরাহের শঙ্কা তৈরির পাশাপাশি পুরো কেনাকাটা শেষ হতে আরও পাঁচ থেকে ছয় মাস সময় লাগতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তাসলিম উদ্দিন জানিয়েছেন, সরকারি নতুন ডায়ালাইসিস সেবা পুরোদমে চালু হতে আগামী বছরের (২০২৭) ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাস পর্যন্ত সময় লেগে যেতে পারে। ফলে অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে রোগীরা কোথায় এবং কীভাবে কম খরচে ডায়ালাইসিস সেবা পাবেন, তার কোনো সুনির্দিষ্ট অন্তর্বর্তীকালীন পরিকল্পনা এখনো চূড়ান্ত হয়নি।

ভুক্তভোগী ও সংশ্লিষ্টদের প্রতিক্রিয়া

মাত্র ৬২১ টাকা বা সরকারি ভর্তুকি সুবিধায় ডায়ালাইসিস সেবা পেয়ে আসা শত শত গরিব ও মধ্যবিত্ত রোগী বর্তমানে চরম আতঙ্ক ও উদ্বেগের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। বেসরকারি হাসপাতালে চড়া মূল্যে চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়া অধিকাংশ রোগীর পক্ষেই অসম্ভব। সাম্প্রতিক এক সংবাদ সম্মেলনে ভুক্তভোগী রোগী ও তাদের পরিবার দাবি জানিয়েছেন যে, নতুন বিকল্প ব্যবস্থা পুরোপুরি চালু না হওয়া পর্যন্ত যেন স্যান্ডরের বর্তমান সেবাটি বন্ধ করা না হয়। প্রয়োজনে দেশীয় কোনো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পিপিপি চুক্তি করে স্যান্ডরের অবকাঠামো ও অভিজ্ঞ জনবল কাজে লাগানোর প্রস্তাবও দিয়েছেন তারা।

অপরদিকে, স্যান্ডর বাংলাদেশের ডায়ালাইসিস সার্ভিসের ম্যানেজার নিয়াজ খান জানান, চুক্তি নবায়নের জন্য তারা আবেদন জানালেও এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পাননি। সরকারের পক্ষ থেকে খরচ কমানোর তাগিদ থাকায় তারা ডায়ালাইসিসের খরচ কমিয়ে ২ হাজার ৮০০ টাকা প্রস্তাব করেছিলেন।

সরকারের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন জানিয়েছেন, স্যান্ডরের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ আর নবায়ন করা হবে না। স্বাস্থ্যসেবার মান ও পরিসর বাড়াতে এবং দেশের অর্থ বাইরে যাওয়া রোধ করতে ইতোমধ্যেই ডায়ালাইসিস মেশিন কেনার টেন্ডার দেওয়া হয়েছে।

তিনি আরও জানান, আগামী তিন-চার মাসের মধ্যে মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০টি এবং জেলার সদর হাসপাতালে ১০টি (যেখানে মেডিকেল কলেজ আছে সেখানে মোট ৬০টি) ডায়ালাইসিস মেশিন বসানো হবে। এর ফলে নভেম্বরের পর জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউটে ৬০টি এবং চট্টগ্রামে ৩০টি নতুন মেশিন বসানো সম্ভব হবে, যা টারশিয়ারি পর্যায়ে ডায়ালাইসিসের চাপ অনেকাংশে কমিয়ে আনবে।

বর্তমান চিত্রের সামগ্রিক পরিসংখ্যান

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে প্রায় ৩ কোটি ৮০ লাখ কিডনি রোগী রয়েছে। এর মধ্যে শেষ ধাপে চলে যাওয়া প্রায় ৪৫ হাজার ডায়ালাইসিস রোগীর মধ্যে মাত্র ১০ শতাংশ (৪ হাজার ৫০০ রোগী) ডায়ালাইসিস সুবিধা পাচ্ছে। সারা দেশে প্রায় ৩০০টি সরকারি-বেসরকারি ডায়ালাইসিস সেন্টার থাকলেও সরকারি সেন্টার রয়েছে মাত্র ১২০টি, যার বেশির ভাগই ঢাকা ও বিভাগীয় শহরে কেন্দ্রীভূত। ৬৪ জেলার মধ্যে মাত্র ২৫টিতে ডায়ালাইসিস সেন্টার থাকায় বাকি ৩৯ জেলায় সরকারি পর্যায়ে কোনো ব্যবস্থাই নেই।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, সরকারের নিজস্ব সক্ষমতা বৃদ্ধির এই উদ্যোগ প্রশংসনীয় হলেও, অন্তর্বর্তীকালীন এই ৩-৪ মাসের শূন্যতা পূরণে দ্রুত সুনির্দিষ্ট কোনো পদক্ষেপ নেওয়া না হলে জীবন বাঁচাতে ডায়ালাইসিসের ওপর নির্ভরশীল সাধারণ রোগীরা চরম বিপদের মুখে পড়বেন।